ইসলামের বিজয় লাভের ১০টি শর্ত
ইসলামের বিজয় প্রত্যেক ইমানদার ব্যক্তির হৃদয়ের একান্ত ব্যাকুলতা, প্রত্যাশা ও স্বপ্ন। কিন্তু তা শুধু স্বপ্ন নির্ভর নয় বরং কর্ম নির্ভর। তাই ইসলামের বিজয়ের পতাকা উড্ডীন করার জন্য মুসলিমদের জন্য যে সকল শর্তাবলী পূরণ করা আবশ্যক কুরআন-সুন্নাহর আলোকে সেগুলো অতি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হল:
❖ ১) ইসলামের বিজয়ের জন্য সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল, মুসলিমগণ ব্যক্তি জীবনে শিরক মুক্ত ঈমান ও বিদআত মুক্ত আমল দ্বারা সমৃদ্ধ হবে। তারপর পরিবারে তার বাস্তবায়ন ঘটাবে। তারপর মানুষের কাছে ধৈর্যের সাথে তার প্রচার-প্রসার ঘটাবে এবং 'সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা'র দায়িত্ব পালন করবে। [বিস্তারিত পড়ুন সূরা আসর (১০৩ নং সূরা) এর ব্যাখ্যা]
❖ ২) সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা এবং বিচ্ছিন্নতা পরিহার:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّـهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّـهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا
"আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমরা সে নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা আল্লাহ তোমাদেরকে দান করেছেন। তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তোমাদের মনে সম্প্রীতি দান করেছেন। ফলে, এখন তোমরা তাঁর অনুগ্রহের কারণে পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ। তোমরা এক অগ্নিকুণ্ডের পাড়ে অবস্থান করছিলে। অতঃপর তা থেকে তিনি তোমাদেরকে মুক্তি দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ নিজের নিদর্শনসমুহ প্রকাশ করেন, যাতে তোমরা হেদায়েত প্রাপ্ত হতে পার।" (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)
তিনি আরও বলেন,
وَأَطِيعُوا اللَّـهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ ۖ وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّـهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"আর আল্লাহ তা’আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমরা কাপুরুষ হয়ে পড়বে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা রয়েছেন ধৈর্য্যশীলদের সাথে।" (সূরা আনফাল: ৪৬)
❖ ৩) হৃদয়ে জিহাদি চেতনা উজ্জিবীত করা এবং জিহাদের শর্তাবলী পূরণ সাপেক্ষে কাফেরদের বিরুদ্ধে জানমাল দ্বারা সর্বাত্মক জিহাদ করা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّـهِ ۖ فَإِنِ انتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ
"আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা জালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)।" (সূরা বাকারা: ১৯৩)
তিনি আরও বলেন,
قَاتِلُوهُمْ يُعَذِّبْهُمُ اللَّـهُ بِأَيْدِيكُمْ وَيُخْزِهِمْ وَيَنصُرْكُمْ عَلَيْهِمْ وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ -وَيُذْهِبْ غَيْظَ قُلُوبِهِمْ ۗ وَيَتُوبُ اللَّـهُ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ ۗ
"যুদ্ধ কর ওদের সাথে, আল্লাহ তোমাদের হস্তে তাদের শাস্তি দেবেন। তাদের লাঞ্ছিত করবেন, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের জয়ী করবেন এবং মুসলমানদের অন্তরসমূহ শান্ত করবেন এবং তাদের মনের ক্ষোভ দূর করবেন। আর আল্লাহ যার প্রতি ইচ্ছা ক্ষমাশীল হবে, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।" (সূরা তওবা: ১৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من مات ولم يغز ولم يحدث به نفسه بالغزو مات على شعبة من نفاق
“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলো যে, কখনো জিহাদও করে নি এবং মনে কখনো জিহাদের প্রতি আগ্রহও সৃষ্টি হয় নি তাহলে সে নেফাকের একটি শাখার উপর মৃত্যু বরণ করলো”। (সহিহ মুসলিম)
❖ ৪) চতুর্দিকে শত্রুর জয়জয়কার, মুসলিমদের অধঃপতন এবং সার্বিক দুরবস্থা দেখে হীনমন্যতায় না ভোগা। বরং হৃদয়ে আল্লাহর রহমত ও সাহায্য প্রাপ্তির আশা উজ্জীবিত রাখা। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ
"আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।" (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)
তিনি আরও বলেন,
وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّـهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّـهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
"তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায়, ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।" (সূরা ইউসুফ: ৮৭)
❖ ৫) সর্ব প্রকার পাপাচার, আল্লাহর নাফরমানি, শিরক, বিদআত, মুনাফেকি, নৈতিক স্খলন, জুলুম-নির্যাতন, অন্যায়-অবিচার, অধিকার হরণ, দুর্নীতি ইত্যাদি থেকে আল্লাহর নিকট তওবা করা এবং নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটানো। তাহলে আল্লাহও আমাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাবেন। অন্যথায় পরিবর্তনের চিত্তাকর্ষক শ্লোগান, ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও স্বপ্ন-পরিকল্পনা সব ভেস্তে যাবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّـهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ۗ
"আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।"(সূরা রা'দ: ১১)
তিনি আরও বলেন,
ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّـهَ لَمْ يَكُ مُغَيِّرًا نِّعْمَةً أَنْعَمَهَا عَلَىٰ قَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ
"তার কারণ এই যে, আল্লাহ কখনও পরিবর্তন করেন না, সে সব নেয়ামত, যা তিনি কোন জাতিকে দান করেছিলেন, যতক্ষণ না সে জাতি নিজেই পরিবর্তিত করে দেয় নিজের জন্য নির্ধারিত বিষয়।" (সূরা আনফাল: ৫৩)
❖ ৬) আল্লাহর দীনকে এবং আল্লাহর দীনের জন্য যারা কাজ করে তাদেরকে সাহায্য করা এবং আল্লাহর বিধানকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَنصُرُوا اللَّـهَ يَنصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
"হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।" (সূরা মুহাম্মদ: ৭)
তিনি আরও বলেন,
وَلَيَنصُرَنَّ اللَّـهُ مَن يَنصُرُهُ
"আল্লাহ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহর সাহায্য করে।" (সূরা হজ্জ: ৪০)
❖ ৭) পূর্বসূরি তথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবিদের জীবনী অধ্যয়ন করা এবং এ বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা যে, তারা কিভাবে তৎকালীন পরাশক্তিগুলোকে পদানত করে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করেছিলেন। সেই সাথে যুগে যুগে ইসলামের বিজয় ইতিহাস অধ্যয়ন করা এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নেয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أُولَـٰئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّـهُ ۖ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ
"এরা এমন ছিল, যাদেরকে আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছিলেন। অতএব, আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন।" (সূরা আনআম: ৯০)
❖ ৮) যুগ পরিক্রমায় বিভিন্ন সময় যে সব কারণে মুসলিমগণ পরাজিত হয়েছে, রাজ্য হারিয়েছে বা তাদের অধঃপতন ঘটেছে সেগুলোর ইতিহাস জানা এবং সেখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
প্রকৃতপক্ষে যে জাতি তাদের পূর্বসূরিদের ইতিহাস জানে না, যাদের শিকড়ের সাথে সম্পর্ক নেই তারা কখনো উন্নত হতে পারে না।
❖ ৯) বর্তমান সময়ে বিশেষ করে মুসলিম যুবক-যুবতী ও নারীদের নৈতিক স্খলন ঘটানো ও তাদেরকে বিপথগামী করার সুদূর প্রসারী নানামুখী ষড়যন্ত্র, ধ্বংসের সুপরিকল্পিত নীল নকশা ও অপ তৎপরতা থেকে রক্ষা করত: তাদেরকে সঠিক ও কল্যাণের পথে পরিচালনা করার জন্য বাস্তবমুখী কর্মসূচী ও উদ্যোগ গ্রহণ করা।
❖ ১০) ইসলামকে বিশ্বের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে ইসলামি শরিয়া ও বৈষয়িক উভয় ক্ষেত্রে শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞানের জগতে উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণের বিকল্প নেই। তৎসঙ্গে মুসলিমদেরকে শুদ্ধ ইসলামি সংস্কৃতি, শিল্পকলা, জ্ঞান-গবেষণা, বিজ্ঞান চর্চা, আবিষ্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের পূর্বপুরুষদের মত পুনরায় অবদান রাখতে হবে। অন্যথায় তাদেরকে ভিখারির মত অন্যদের দিকে চেয়ে থাকতে হবে। এভাবে কখনো বিজয়ী হওয়া সম্ভব নয়।
পরিশেষ দুআ করি, আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে সকল পাপাচার ও অন্যায়-অবিচার থেকে রক্ষা করুন, তাদের মধ্যে ঈমানের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ প্রজ্বলিত করুন, এবং অলসতা, অকর্মণ্যতা, দুর্বলতা ও হীনমন্যতাকে বিদায় করে তাদের হৃদয়ে শক্তি ও সাহসের বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিন এবং পরিশুদ্ধ জ্ঞান, উন্নত সভ্যতা এবং আকর্ষণীয় চরিত্র মাধুরী দ্বারা মানুষের হৃদয় রাজ্য জয় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬◐◯◑▬▬▬▬▬
লেখক:
মুফতী মুহাম্মাদ আল-মাদানী
— আরবী সাহিত্য বিভাগ
🌸 জামিয়া ইসলামিয়া মুহাম্মাদিয়া দারুল উলূম ঢাকা 🌹

No comments:
Post a Comment