🌙 মক্কা থেকে নবীজি ﷺ–এর মদিনায় আগমনের ইতিহাস
একটি আলো–আগমনের গল্প
মদিনার আকাশ সেদিন যেন অন্যরকম আলোয় দীপ্ত হচ্ছিল। বাতাসে ছিল এমন এক প্রশান্তি—যেন শহরটি বহু যুগ ধরে অপেক্ষা করছে তার প্রিয়তম অতিথি, বিশ্বনবী মুহাম্মদ ﷺ–কে বরণ করার জন্য।
প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি উঠোন, প্রতিটি মানুষের হৃদয়—সবাই প্রস্তুত ছিল হিজরতের ইতিহাসময় সেই মুহূর্তকে স্বাগত জানানোর জন্য।
🌙 মক্কার বিদায় — হিজরতের কঠিন সিদ্ধান্ত
মক্কার ভূমিতে অত্যাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় রাসূল ﷺ–কে হিজরতের অনুমতি দিলেন।
মুসলমানরা ইতিমধ্যে দলে দলে মদিনায় চলে গেছেন; কিন্তু নবীজি ﷺ অপেক্ষা করছিলেন আল্লাহর নির্দেশের।
এক রাত, অন্ধকার নেমে আসলে,
নবীজি ﷺ তাঁর ঘর থেকে বের হয়ে সহচর আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর সাথে গার-এ-সাওর গুহায় আশ্রয় নিলেন।
তিন দিন তিন রাত—
বাহিরে কাফিরদের তীব্র অনুসন্ধান,
আর গুহার ভেতরে ছিল আল্লাহর রহমত, শান্তি ও নিরাপত্তা।
কুরআনে এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—
> إِذۡ يَقُولُ لِصَاحِبِهِۦ لَا تَحۡزَنۡ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَنَا
“তিনি তাঁর সাথীকে বললেন: ভয় পেয়ো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।”
(সূরা আত-তাওবা ৯:৪০)
এই আয়াত আজও ঈমানীদের হৃদয়ে নিরাপত্তা ও তাওয়াক্কুলের মশাল হয়ে আছে।
🐪 মদিনার পথে দীর্ঘ যাত্রা
গার-এ-সাওর থেকে বের হয়ে শুরু হলো প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের দীর্ঘ যাত্রা—
মরুভূমির উত্তপ্ত বালু, খাড়া পাহাড়, অনাবাদি নির্জন পথ।
নবীজি ﷺ এই দীর্ঘ সফরে মাঝে মাঝে কুরআন তিলাওয়াত করতেন;
আর আবু বকর (রাঃ) কখনো সামনে, কখনো পিছনে, কখনো ডান পাশে—
শুধু একটাই শঙ্কা:
“রাসূলুল্লাহ ﷺ যেন কোনো বিপদে না পড়েন।”
এ যাত্রায় একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা হলো—
আসমা বিনতে আবু বকর (রাঃ)-এর ত্যাগ ও সাহস।
তিনি রাতে খাবার পৌঁছে দিতেন, কাপড়ের টুকরো ছিঁড়ে আঁট বানিয়েছিলেন।
সেই দৃশ্য দেখে নবীজি ﷺ তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন—
আর ইতিহাস তাঁকে নামে চেনে “জ়াতুন নিতাকাইন”—দুই আঁটের মালিক মহিলা।
🌴 মদিনার অপেক্ষা — প্রতিটি দিন আশা ভরা
মদিনার আনসাররা প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শহরের বাইরে এসে দাঁড়াতেন—
শুধুমাত্র এক ঝলক দেখার জন্য,
“আজ কি আমাদের প্রিয় নবীজি ﷺ আসবেন?”
শিশুরা খেলতে খেলতে বলত—
“হয়তো আজ! হয়তো আজ সেই মহান দিন!”
পুরো শহর ছিল আকুল প্রতীক্ষায়।
🌟 অবশেষে আগমনের মহিমান্বিত মুহূর্ত
অবশেষে একদিন দূর থেকে দেখা গেল একদল যাত্রী—
ধুলোয় ভরা শরীর, কিন্তু মুখে নূরের জ্যোতি।
আনসাররা দৌড়ে খবর দিল—
“তিনি এসেছেন! তিনি এসেছেন!”
মদিনার রাস্তাগুলো আনন্দে কেঁপে উঠল।
নারীরা ছাদে উঠলেন সাহাবায়াতের সেই কালজয়ী তাক্ববিরধ্বনি ও শোকরগাথা সুর নিয়ে—
> طَلَعَ البَدْرُ عَلَيْنَا
“চাঁদ আমাদের ওপর উদিত হয়েছে—সেই পূর্ণিমার চাঁদ!”
শিশুরা উল্লাসে ছুটল,
পুরুষরা অশ্রুসিক্ত চোখে নবীজি ﷺ–কে দেখতে ছুটল।
সেই দিন যেন মদিনার প্রতিটি ইট, প্রতিটি গাছ, প্রতিটি বাতাস আনন্দে কম্পমান ছিল।
🕌 মদিনার পথে প্রথম বিরতি — মসজিদে কুবা
মদিনায় প্রবেশের আগে নবীজি ﷺ কুবা নামক স্থানে পৌঁছালেন।
সেখানে তিনি চার দিন অবস্থান করেন এবং সাহাবাদের সাথে মিলিত হয়ে নির্মাণ করেন—
ইসলামের প্রথম মসজিদ — মসজিদে কুবা
হাদিসে এসেছে—
> “যে ব্যক্তি কুবা মসজিদে এসে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, সে একটি উমরাহর সমান প্রতিদান পায়।”
(তিরমিযী, নাসায়ী)
এই মসজিদে ছিল মুহাজির ও আনসারদের অদম্য ভালোবাসা, ঐক্য ও ত্যাগ।
🏠 মদিনায় প্রবেশ — নতুন যুগের সূচনা
মদিনার ভেতরে প্রবেশ করলে মানুষ নবীজি ﷺ–এর উটনীর লাগাম ধরতে চাইত।
প্রত্যেকে চাইত—
“রাসুল ﷺ আমাদের ঘরেই থাকুন!”
কিন্তু নবীজি ﷺ বললেন—
> “উটনীকে ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর নির্দেশেই চলবে।”
অবশেষে উটনী থামল আবু আইয়ুব আনসারি (রাঃ)–এর দরজায়।
সেই ঘরেই নবীজি ﷺ প্রথম অবস্থান করেন।
সেখান থেকেই শুরু হয়—
✨ ইসলামের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
✨ ভ্রাতৃত্বের ঘোষণা (মুয়াখাত)
✨ মসজিদে নববীর নির্মাণ
✨ ইমানভিত্তিক সভ্যতার সূচনা
মদিনা সেদিন শুধু একজন মানুষকে বরণ করেনি—
বরণ করেছিল আলো, সত্য, রহমত, এবং সমগ্র মানবতার দিশারিকে।
📌 হিজরতের আগমন—যা প্রতিষ্ঠা করল
✔ মুসলমানদের নিরাপত্তা
✔ ইসলামের স্বাধীন চর্চার সুযোগ
✔ প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি
✔ নতুন সভ্যতার জন্ম
✔ দুনিয়ার মানচিত্র বদলে যাওয়ার ঘোষণা
হিজরত ছিল ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়—
সম্পূর্ণ মানবজাতির ভাগ্য পরিবর্তনের সূচনা
.jpeg)





