Thursday, November 27, 2025

 

 উপমহাদেশের প্রথম হাদীছচর্চা কেন্দ্র

   ফিরে দেখা পূর্ব পুরুষদের সোনালী অতীত   


বাংলার হাদীস–সভ্যতার হারিয়ে যাওয়া এক বিশাল অধ্যায়


বাংলা মুসলমানদের অতীত কখনোই অন্ধকার ছিল না—বরং ছিল আলোকোজ্জ্বল জ্ঞানচর্চা, দাওয়াহ, ফিকহ, হাদীস ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের এক সুবর্ণ যুগ। আজ থেকে প্রায় সাড়ে সাতশ’ বছর আগে, যখন বাঙালি মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক রূপায়ণও পুরোপুরি সুসংহত হয়নি, তখনই এই ভূমিতে গড়ে ওঠে বিশ্বমানের হাদীস শিক্ষা কেন্দ্র। এমন এক সময়ে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ইলমে-হাদীসের তারকারা ক্রমান্বয়ে উদিত হওয়া শুরু করেছেন, ঠিক তখনই এই বাংলার বুকে বসে হাদীস পড়াতেন এক বিশ্বমানের মুহাদ্দিস—


ইমাম আল্লামা শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা রাহিমাহুল্লাহ।


🕌 বাংলায় হাদীস দরসের শুরু: ইবনে হাজারের জন্মেরও ১০০ বছর আগে!


ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী (রাহ.)—যিনি ১৩৭২ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন—তাঁর জন্মের পুরো এক শতাব্দী আগে, অর্থাৎ ১২৭২ সালের দিকে, বাংলায় নিয়মিতভাবে হাদীসের দরস অনুষ্ঠিত হতো। ছাত্র সংখ্যা ছিল চার-পাঁচশ নয় বরং প্রায় ১০,০০০ শিক্ষার্থী। সুদূর বোখারা, কান্দাহার, খোরাসান, সিরিয়া, ইয়েমেন, বিহার,

দাক্ষিণাত্য এসব অঞ্চলের ইলমপিপাসুরা দলে দলে বাংলায় ছুটে আসতেন। ভাবুন! যে বাংলাকে আমরা আজও ইসলামী শিক্ষার ‘পেরিফেরি’ মনে করি—সেই বাংলা তখন বিশ্বমানের ছাত্র-শিক্ষকের সমাবেশস্থল ছিল।


এই দরসে হাদীস পড়ানো হতো সহীহুল বুখারী, সহীহ মুসলিম, এবং বিখ্যাত মুসনাদে আবু ইয়ালা থেকে।

অর্থাৎ বাংলার শিক্ষা কোনোক্রমেই উপশহুরে বা প্রাথমিক স্তরের ছিল না—বরং ছিল গবেষণা পর্যায়ের।


📚 বাংলার প্রথম মুহাদ্দিস: শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রাহ.)


তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের প্রথম যুগের মুহাদ্দিস, যিনি আন্তর্জাতিক মানের হাদীস-শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর পরিচয় শুধু একজন শিক্ষক নয়, তিনি ছিলেন বাংলায় হাদীস–সভ্যতার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী একজন ইমামুল মুহাদ্দিসীন।


▣ দিল্লিতে ১০ বছরের অধ্যাপনা


বাংলায় আগমনের পূর্বে তিনি দিল্লির বড় বড় মাদরাসায় টানা ১০ বছর দারস ও তাদরীসে নিয়োজিত ছিলেন। তাঁর জ্ঞানের খ্যাতি দিল্লি থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা ভারত উপমহাদেশে।


🕌 সোনারগাঁয়ে প্রতিষ্ঠিত তাঁর “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়”


বাংলার ঐতিহাসিক রাজধানী সোনারগাঁয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর সুবিশাল দারুল-ইলম। এটি ছিল আধুনিক অর্থে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।


📘 সিলেবাস ও কারিকুলাম ছিল বহুমাত্রিক ও উন্নতমানের:


হাদীস, ফিকহ, আরবি সাহিত্য, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস,অলংকারশাস্ত্র, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান (Physics), রসায়ন (Chemistry), থিউলজি (Aqidah ও Kalam)


অর্থাৎ এটা ছিল দ্বীনি ও দুনিয়াবি জ্ঞানের অনবদ্য সমন্বয়, ঠিক যেমন মদিনার, বুখারার বা বাগদাদের প্রাচীন দারুল-ইলমগুলোতে দেখা যেত।


আজ আমরা যাকে “ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়” ধারণা বলি—আবু তাওয়ামা (রাহ.) তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৩শ শতকেই।


🌏 বাংলায় হাদীসের দরস চলছিল যখন…


দামেশকে তখন শুরু হয়েছে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রাহ.)-এর মহাদরস।


স্পেনের কার্ডোভায় চলছিল ইমাম কুরতুবী (রাহ.)-এর তাফসীরের সুবিশাল আলোচনা।


তখনও জন্মগ্রহণ করেননি, ইমাম যাহাবী (রাহ.), ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রাহ.) কিংবা আরও বহু উলামায়ে কিরাম…


অর্থাৎ বাংলার ভূমি ইলমের দৌড়ে কোনো অংশেই পিছিয়ে ছিল না; বরং বিশ্বমানের শিক্ষার ধারায় এক উজ্জ্বল অবস্থান ধরে রেখেছিল।


🕌 আজও দাঁড়িয়ে আছে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধ্বংসাবশেষ


সোনারগাঁয়ের নিঃশব্দ নিসর্গে আজও দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সেই শিক্ষা নগরী। কিন্তু নেই সেই প্রাঞ্জল কণ্ঠের দরস, নেই ছাত্রদের গমগম শব্দ, নেই কুরআন-হাদীসের অনুরণন।


ইতিহাসের বুকে তা রয়ে গেছে চাপা স্মৃতি, কিন্তু আমাদের সমাজের স্মৃতিতে রক্ষা পায়নি। তাঁর নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই, নেই কোন গবেষণা কেন্দ্র, নেই পাঠ্যপুস্তকে তাঁর নাম।


বাংলার প্রথম মুহাদ্দিস যার, তাঁর স্মৃতি আজ আমাদের কাছে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক রত্ন।


🌟 শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রাহ.)—বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের পথিকৃৎ, তিনি ছিলেন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির, গভীর প্রজ্ঞার, অসাধারণ পরিকল্পনাশক্তির অধিকারী। তাঁর ইলম, দাওয়াহ, কারিকুলাম, চিন্তা ও সংস্কার—সবকিছুই বাঙালি মুসলমান সমাজে আলোকধারার মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর হাতে গড়ে ওঠে এমন একটি জ্ঞানসমাজ, যার আলো আজও নিভে যায়নি—যদিও আমরা তাঁর নাম ভুলে গেছি।


🖼️ সোনারগাঁও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিরল ছবি


এই বাংলায় হাদীস শিক্ষার স্বর্ণযুগের সাক্ষী শাইখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা (রাহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সোনারগাঁও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় এর একটি দুর্লভ ছবি নিচে উপস্থাপিত হলো।


📢 শেষ কথা: আমাদের কি করা উচিত?


বাংলার এই সোনালী হাদীস–ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা আমাদের দায়িত্ব। তাঁর নামে গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা বা লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি।


এ জাতি যে ইলমের আলোয় আলোকিত ছিল—তা নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে।


মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন।

No comments:

Post a Comment

  🌙 মক্কা থেকে নবীজি ﷺ–এর মদিনায় আগমনের ইতিহাস একটি আলো–আগমনের গল্প মদিনার আকাশ সেদিন যেন অন্যরকম আলোয় দীপ্ত হচ্ছিল। বাতাসে ছিল এমন এক প্...