Tuesday, November 25, 2025

 


নবী–রাসূলগণ মাসূম এবং সাহাবায়ে কেরামগণ সত্যের মাপকাঠি।


— কুরআন, সহীহ সুন্নাহ ও ঐতিহাসিক দলীলসমূহের আলোকে


প্রস্তাবনা


ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন যেখানে আল্লাহ তাআলা সত্যকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন এবং সেই সত্যের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্বাচিত করেছেন মাসূম নবী–রাসূল এবং তাঁদের পথে চলা বিশ্বস্ত সাহাবায়ে কেরামকে।

বিশ্বব্যবস্থায় সত্য–মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ে যদি কোন যুগে সর্বোত্তম মানদণ্ড থাকে, তা হলো ওহীর আলোকে পরিচালিত নবী–রাসূলগণ এবং তাদের সরাসরি শিক্ষা ও সঙ্গ লাভকারী সাহাবাগণ।


প্রথম অধ্যায়: নবী–রাসূলগণের মাসূমিয়্যত


১. মাসূম (معصوم) অর্থ


মাসূম অর্থ: আল্লাহর পক্ষ থেকে সুরক্ষাপ্রাপ্ত; বড় বড় পাপ, কুফর, শিরক, ভুল আকীদা, শরীয়ত বিরোধী কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে আল্লাহর বিশেষ হেফাজতে থাকা।


কেন প্রয়োজন?


যেহেতু নবী–রাসূলগণ মানুষকে আল্লাহর বাণী পৌঁছান, তাই তাঁদের ভুলে–বশত সত্য নষ্ট হলে দীন নষ্ট হয়ে যেত। এজন্যই আল্লাহ তাঁদেরকে ওহীর তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত রেখেছেন।


২. কুরআন থেকে দলীল


(১) আল্লাহর নির্দেশ: নবী ভুল বলেন না

> وَمَا يَنطِقُ عَنِ الْهَوَى، إِنْ هُوَ إِلَّا وَحْيٌ يُوحَى

(সূরা নজম, ৩–৪)

অর্থ: তিনি নিজের ইচ্ছায় কিছু বলেন না—এটা ওহী ব্যতীত কিছু নয়।

➡ প্রমাণ: রাসূল ﷺ-এর কথা ওয়হীর আলোতে সঠিক—এতে ভুল বা ব্যত্যয় নেই।


(২) আল্লাহ সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন

> اللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ

(সূরা মায়িদা, ৬৭)

অর্থ: আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন।

➡ অর্থ: তাবলীগে, শরীয়তে কোনো ভুল যেন না ঘটে, আল্লাহ তা নিশ্চিত করেছেন।


(৩) নবীর অনুসরণ মানেই হেদায়েত

> وَإِن تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا

(সূরা নূর, ৫৪)

অর্থ: তোমরা তাঁকে মানলে অবশ্যই পথপ্রাপ্ত হবে।

➡ যদি নবী ভুল করতেন, তবে তাঁর আনুগত্য থেকে হেদায়েত আসত না।


৩. হাদীস থেকে দলীল


(১) রাসূল ﷺ নিজেকে ভুল থেকে মুক্ত বলেছেন

> “নিশ্চয়ই আমাকে আমার প্রতিপালক শিখিয়েছেন এবং উত্তম শিক্ষা দিয়েছেন।”

— (হাকিম, আল-মুস্তাদরাক, ২/৬১৩)


(২) রাসূল ﷺ বলেন: উম্মত কখনো একত্র হয়ে ভুলের উপর সম্মত হবে না

— (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩৯৫০)


এ সত্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন উম্মতের সর্বপ্রথম ও সর্বোত্তম অংশ সাহাবায়ে কেরাম সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত ও সত্যনিষ্ঠ।


দ্বিতীয় অধ্যায়: সাহাবায়ে কেরাম—সত্যের মাপকাঠি (الصحابة معيار الحق)


১. সাহাবা কেন সত্যের মানদণ্ড?


(১) তাঁরা সরাসরি নবী ﷺ-এর শিক্ষা পেয়েছেন


সাহাবাগণ ছিলেন ওহীর যুগের মানুষ। যে দীন আল্লাহ নাজিল করেছেন, তার প্রথম বাস্তব প্রত্যক্ষকারী এঁরা।


(২) তাঁদের ঈমান ও চরিত্র আল্লাহ স্বয়ং প্রশংসা করেছেন


২. কুরআনের দলীল


(১) আল্লাহ তাঁদের জন্য সন্তুষ্টি ঘোষণা করেছেন

> وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ… رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ

(সূরা তাওবা, ১০০)

➡ আল্লাহ যাঁদের উপর সন্তুষ্ট—তাঁরা সত্যের মানদণ্ড না হলে কে হবে?


(২) আল্লাহ তাঁদেরকে নক্ষত্রের সাথে তুলনা করেছেন (ইশারা)

> كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ

(সূরা আলে ইমরান, ১১০)

➡ উম্মতের শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবাগণ।


৩. হাদীসের দলীল


(১) রাসূল ﷺ বলেন: আমার সাহাবাদের সম্মান রক্ষা করো


> “আমার সাহাবাগণকে গালি দিও না। আমার প্রাণ যার হাতে, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বতের সমপরিমাণ সোনা দান করে, তবুও তাদের একজনের এক মুঠো বা অর্ধেক মুঠো দানের সমান হবে না।”

— সহীহ বুখারি (৩৬৭৩)


➡ কারণ: তাঁদের আমল–নিষ্ঠতা সরাসরি নুবুওতের তত্ত্বাবধানে গঠিত।


(২) সহীহ পথ: সাহাবাদের পথ

> “আমার উম্মত ৭৩টি দলে বিভক্ত হবে। একটি দল নাজাত পাবে—

যারা আমার এবং আমার সাহাবাদের পথ অনুসরণ করবে।”

— তিরমিজি (২৬৪১)


➡ হক পথের মানদণ্ড = নবীর পথ + সাহাবাদের পথ।


তৃতীয় অধ্যায়: আকীদাহ ইমামদের বক্তব্য


১. ইমাম তহাবী (رحمه الله)

> “নবীগণ ভুল, ভুলোমতি এবং অপরাধ থেকে মাসূম।”

— আকীদাহ তহাবিয়্যাহ


২. ইমাম নওবী (رحمه الله)

> “সাহাবাদের প্রতি সন্দেহকারী ব্যক্তি ইসলাম থেকে বিপথগামী।”

— শরহ মুসলিম, ভূমিকা


৩. ইবনে তাইমিয়্যা (رحمه الله)

> “সাহাবাদের অনুসরণ করাই সত্যের মানদণ্ড।”

— মিনহাজুস সুন্নাহ (৪/৩৭৪)


চতুর্থ অধ্যায়: কেন নবী–রাসূল মাসূম না হলে দীন নষ্ট হয়ে যেত?


১. ভুল পয়গাম দীনকে বিকৃত করত


ইতিহাসে দেখা যায়—

● ইহুদিরা নবীদের ভুলের নামে বড় বড় মিথ্যা আরোপ করেছিল

● খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.) সম্পর্কে ভুল বিশ্বাস গঠন করেছিল


ইসলামে তাই আল্লাহ নবীদেরকে ভুল থেকে সুরক্ষিত রেখেছেন।


২. সাহাবারা সত্য না হলে হাদীস–তাফসীর নষ্ট হয়ে যেত


হাদীস, তাফসীর, ফিকহ—সবকিছু সাহাবাদের মাধ্যমেই এসেছে।

তাঁরা যদি সত্যনিষ্ঠ না হতেন, তাহলে পুরো শরীয়তের ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যেত।


পঞ্চম অধ্যায়: উপসংহার


নবী–রাসূলগণের মাসূমিয়্যত এবং সাহাবায়ে কেরামের সত্যনিষ্ঠা ইসলামের ভিত্তি।

নবীগণ সত্যের উৎস

সাহাবাগণ সত্যের বাহক

এ দুটির সমন্বয়ে আজকের কুরআন–সুন্নাহ আমাদের কাছে বিশুদ্ধভাবে পৌঁছেছে।


যে ব্যক্তি সত্য খুঁজতে চায়—

সে নবী ﷺ-এর সুন্নাহ ও সাহাবাগণের পথ অনুসরণ করলেই সত্য পাবে।



মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন ইয়া রাব্বাল আলামিন।




No comments:

Post a Comment

  🌙 মক্কা থেকে নবীজি ﷺ–এর মদিনায় আগমনের ইতিহাস একটি আলো–আগমনের গল্প মদিনার আকাশ সেদিন যেন অন্যরকম আলোয় দীপ্ত হচ্ছিল। বাতাসে ছিল এমন এক প্...